জেলা পরিষদ থেকে পঞ্চায়েত— সরকারি দপ্তরে পাল্টাল ছবির বিন্যাস, ভারতমাতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙিয়ে সরানো হল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিকৃতি
সেখ রিয়াজুদ্দিন, বীরভূম: সদ্যসমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে নাটকীয় পালাবদল ঘটেছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে প্রশাসনিক স্তরেও। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের আবহে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা জুড়ে শুরু হয়েছে সরকারি দপ্তরগুলির অভ্যন্তরীণ প্রতীকী পরিবর্তন। সেই ধারাবাহিকতায় সোমবার বীরভূম জেলার একাধিক সরকারি ও আধা-সরকারি দপ্তরে ভারতীয় জনতা পার্টির উদ্যোগে একযোগে পালিত হল বিশেষ কর্মসূচি, যার মূল লক্ষ্য ছিল সরকারি ভবনগুলিতে টাঙানো প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ও ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগো অপসারণ করে তার পরিবর্তে ভারতমাতা ও দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবি স্থাপন করা।
উল্লেখ্য, সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ফলাফল প্রকাশের পরই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যায় রাজনৈতিক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ— কোথাও তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিস দখল, কোথাও দলীয় পতাকা অপসারণ, আবার কোথাও রং পরিবর্তনের মতো ঘটনাও সামনে আসে। যদিও এই সমস্ত ঘটনায় বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়ক ও জেলা নেতৃত্ব সরেজমিনে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন এবং যেকোনও ধরনের বিশৃঙ্খলার তীব্র নিন্দা জানান। আক্রান্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের নিরাপত্তা ও ভয়মুক্ত পরিবেশের আশ্বাস দেন তাঁরা।
একই সঙ্গে দলীয় কর্মীদের কড়া বার্তা দিয়ে জানানো হয়, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বরদাস্ত করা হবে না এবং প্রশাসনকে দলীয় পরিচয় না দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। এর ফলে উত্তপ্ত এলাকাগুলিতেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসে।
গত ৯ মে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর শপথ গ্রহণের পর প্রশাসনিক স্তরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হতে শুরু করে। তারই অংশ হিসেবে সোমবার মহকুমা শাসকের দপ্তর, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, পঞ্চায়েত সমিতি, গ্রাম পঞ্চায়েত-সহ একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিজেপি কর্মী ও নেতৃত্বের উপস্থিতিতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছবি সরিয়ে ফেলা হয়। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের জানিয়ে দেওয়া হয়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সরকারি নিয়ম মেনে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবিও সেখানে টাঙাতে হবে।
শুধু প্রতীকী পরিবর্তনেই থেমে থাকেনি এই কর্মসূচি। একাধিক জায়গায় বিজেপি কর্মীদের পক্ষ থেকে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান এবং অন্যান্য জনপ্রতিনিধিদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। পাশাপাশি তাঁদের উদ্দেশে বার্তা দেওয়া হয়— রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক না কেন, সরকারি দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে।
খয়রাসোল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অসীমা ধীবর জানান, “বিজেপি নেতৃত্ব এসে ভারতমাতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙিয়ে গিয়েছেন এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর ছবিও দ্রুত টাঙানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে পঞ্চায়েত সমিতির প্রশাসনিক কাজ নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।”
অন্যদিকে সিউড়ি পৌরসভার চেয়ারম্যান উজ্জ্বল চ্যাটার্জিও সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, নতুন প্রশাসনিক নির্দেশ অনুযায়ী ভবিষ্যতে সরকারি কার্যালয়গুলিতে ভারতমাতা, প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর ছবি রাখা হবে।
রামপুরহাট মহকুমা শাসকের কার্যালয়ে মহকুমা শাসক উপস্থিত না থাকলেও অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের উপস্থিতিতে এই কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।
রাজনৈতিক পালাবদলের এই প্রতীকী অধ্যায় যে আগামী দিনে আরও বিস্তৃত প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার, এই পরিবর্তন রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।