সাধন মন্ডল, বাঁকুড়া: ২০০৫ থেকে ১১ সাল পর্যন্ত জঙ্গলমহল এলাকায় দিবারাত্রি গুলির শব্দ ও পুলিশের বুটের আওয়াজ। প্রায় দিনেই রক্ত ঝরতো জঙ্গলমহলে কোথাও সিপিএম নেতাকে গুলি করে মারা হয়েছে আবার কোথাও পুলিশকে মেরেছে মাওবাদীরা। একসময় সারেঙ্গা ব্লকের পিরোর গাড়ি মোড় বাজারে সারেঙ্গা থানার টহলদারি পুলিশ ভ্যানের পুলিশ কর্মীরা যখন রাস্তার পাশে থাকা হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন তখনি অতর্কিত মাওবাদীদের আক্রমণে তিন পুলিশ কর্মী নিহত হয়েছেন ও তাদের আগ্নেয়াস্ত্র লুট করা হয়েছে। সেই দিন শেষ হয়েছে দিন বদলেছে অনুন্নয়নের ছোঁয়াকে হাতিয়ার করে মাওবাদীদের যে উত্থান হয়েছিল সেই অনুন্নয়ন আর নেই, উন্নয়নের ছোঁয়ায় এগিয়ে চলেছে জঙ্গলমহল। এলাকার অনুন্নয়ন নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিলাম, সেই সময় বদলেছে’, উন্নয়নের জোয়ারে জঙ্গলমহল বাঁকুড়ায় বন্দুক ছাড়লেন তিন শীর্ষ মাওবাদী নেতা নেত্রী।
আজ বুধবার বাঁকুড়া জেলা পুলিশ লাইনে এডিজি, আনন্দ কুমার, ডিআইজি অভিষেক মোদি ও বাঁকুড়া পুলিশ সুপার পিভিজি সতীশ এর সামনে আত্মসমর্পণ করলেন তিন মাওবাদী নেতা নেত্রী।সময় বদলের ফলে বন্দুক ছেড়ে মূলস্রোতে ফেরার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বুধবার বাঁকুড়া পুলিশ লাইনে এমনই বললেন মাওবাদী নেতা রামপ্রসাদ মান্ডি ওরফে মহাদেব ওরফে শচীন। তাঁর সঙ্গে একই দিনে আত্মসমর্পণ করলেন জোনাল কমিটির সদস্যা জবা মাহাতো ওরফে বুলু ওরফে গোরি এবং নয়নতারা সাহু ওরফে মিতা ওরফে ঝুমা। পশ্চিমাঞ্চলের এডিজি আনন্দ কুমারের সামনে তিন জন তাদের আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।
বাঁকুড়া পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তিন জনের বিরুদ্ধে সব মিলিয়ে ৭৫টিরও বেশি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে খুন, ইউএপিএ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনের মতো গুরুতর ধারায় মামলা রয়েছে। আত্মসমর্পণের সময় পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় দু’টি ইনসাস রাইফেল এবং একটি একে-৪৭। সঙ্গে ছিল ১০টি ম্যাগাজিন এবং ১৫৪ রাউন্ড গুলি। পুলিশের দাবি, ওই আগ্নেয়াস্ত্রগুলির মধ্যে কয়েকটি আগে পুলিশের কাছ থেকে ছিনতাই করা হয়েছিল।
এ দিন আত্মসমর্পণের পরে শচীন তার বক্তব্যে বলে , সময়ের সঙ্গে তাঁর ভাবনায় বদল এসেছে। এক সময় এলাকার অনুন্নয়ন এবং মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তাঁরা আন্দোলনে নেমেছিলেন, সেই সময়ের পরিস্থিতি এখন আর নেই। ফলে সেই পুরনো পথ আঁকড়ে থাকারও প্রয়োজন নেই। অস্ত্রের পথ ছেড়ে সমাজের মূলস্রোতে ফেরার সিদ্ধান্তের পিছনে পরিবর্তিত পরিস্থিতিকেই গুরুত্ব দেন তিনি।
বাঁকুড়া পুলিশ লাইনে আত্মসমর্পণ করার পর সাংবাদিকরা তিন মাওবাদীকে অতীতের রক্তাক্ত পর্ব নিয়েও প্রশ্ন করেন বিশেষ করে জ্ঞানেশ্বরী রেল দুর্ঘটনা এবং শিলদা ইএফআর ক্যাম্পে মাওবাদী হামলার প্রসঙ্গ ওঠে। সেই সময়ের মাওবাদী আন্দোলন, তাঁদের ভূমিকা এবং ওই ঘটনাগুলির সঙ্গে তাঁদের যোগ নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। আত্মসমর্পণের মঞ্চে উঠে আসে জঙ্গলমহলের সশস্ত্র আন্দোলনের সেই পুরনো দিনের কথাও।
বাঁকুড়া জেলা পুলিশের দাবি, জবা, নয়নতারা এবং শচীন দীর্ঘদিন ধরে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় সক্রিয় ছিলেন। ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূমের কোলহান এলাকাতেও তাঁদের সংগঠনের কাজকর্ম ছিল। তিন জনের আত্মসমর্পণকে তাই জঙ্গলমহলে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানের ফলেই এই সাফল্য এসেছে।
এক সময় অনুন্নয়নের অভিযোগ তুলে যে পথে পা বাড়িয়েছিলেন, বুধবার সেই পথ থেকে সরে এলেন জবা মাহাতো, নয়নতারা সাহু এবং রামপ্রসাদ মান্ডি ওরফে শচীন। তাঁদের হাতে থাকা একে-৪৭, ইনসাস এবং গুলি জমা পড়ল পুলিশের হাতে। শচীনের কথায়, ‘ সময় বদলেছে।’ সেই বদলের সঙ্গেই শেষ হল তাঁদের সশস্ত্র জীবনের একটি অধ্যায়। আমরা সমাজের মূল স্রোতে ফিরে সুস্থ জীবন যাপন করতে চাই বলে আজকে আত্ম সমর্পণকারী মাওবাদী নেতা-নেত্রীরা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন।।