কলমে : স্বামী আত্মভোলানন্দ পরিব্রাজক
মহাকাব্য রামায়ণ ও পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মহারাষ্ট্রের পবিত্র গোদাবরী নদীর তীরে অবস্থিত নাসিক শুধু একটি শহর নয়, এটি হাজার বছরের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, প্রাচীন ইতিহাস আর আধুনিকতার এক আশ্চর্য মেলবন্ধন এক মহাতীর্থ। গোদাবরীকে বলা হয় দক্ষিণের গঙ্গা। এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে নাসিকের যত পুণ্যকথা।
নাসিক নামটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ "নাসিকা" বা নাক থেকে। বনবাস কালে ভগবান রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ যখন এই অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন, তখন পঞ্চবটি নামে পরিচিত ছিল। তখন রাবণের বোন শূর্পনখা রামের প্রতি আকৃষ্ট হন। রাম ও লক্ষ্মণ উভয়েই তাকে প্রত্যাখ্যান করলে, ক্ষুব্ধ হয়ে শূর্পনখা সীতাকে আক্রমণ করতে যান। তখন লক্ষ্মণ তার নাসিকা বা নাক কেটে দেন। যে স্থানে এই ঘটনাটি ঘটেছিল, সেটি পরবর্তীতে নাসিকা বা নাসিক নামে পরিচিত লাভ করে।
অতীতের বিভিন্ন যুগে এই অঞ্চলের নাম আলাদা ছিল - সত্যযুগে ছিল পদ্মনগর, ত্রেতাযুগে - ত্রিকণ্টক, দ্বাপরযুগে ছিল জনস্থান। মুঘল আমল মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে এর নাম রাখা হয়েছিল - গুলশানাবাদ। পরবর্তীতে ১৭৫২ সালে মারাঠারা অঞ্চলটি পুনরুদ্ধার করার পর এর নাম আবার নাসিক রাখা হয়।
ধর্মের দিক থেকে ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির নাসিক শহর থেকে ২৮ কিমি দূরে ব্রহ্মগিরি পাহাড়ের কোলে অবস্থিত। ভারতের ১২ - জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে এটি অন্যতম এবং একমাত্র ত্রিমুখী লিঙ্গ - ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। এখান থেকেই গোদাবরীর উৎপত্তি। ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গই নাসিকের প্রাণ।
রামায়ণ বলে, ১৪ বছরের বনবাসে রাম-সীতা-লক্ষ্মণ নাসিকের পঞ্চবটীতেই ছিলেন। পাঁচটি বটগাছ থেকেই নাম পঞ্চবটী। এখান থেকেই রাবণ সীতাকে হরণ করেছিল। পাশেই গোদাবরীর রামকুণ্ড -- যেখানে স্নান করলে পাপমুক্তি হয় বলে বিশ্বাস। কাছেই কালারাম মন্দির কালো পাথরের রাম ও সীতা গুফা।
ইতিহাসের নাসিক পাণ্ডব-লেনি গুহা খ্রিস্টপূর্ব ১ম থেকে ৩য় শতাব্দীতে পাহাড় কেটে বানানো ২৪টি বৌদ্ধ গুহা। হাতি, ঘোড়ার মূর্তি, ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ - ইতিহাস-প্রেমীর চোখ জুড়িয়ে যায়।
প্রকৃতি ও অ্যাডভেঞ্চারের নাসিক সোমেশ্বর জলপ্রপাত ও গঙ্গাপুর বাঁধ, বর্ষায় গোদাবরীর রূপ দেখার মতো। শান্ত বিকেলে পিকনিকের আদর্শ জায়গা।
নাসিকের হরিহর ফোর্ট ও অঞ্জনেরি পাহাড় ট্রেকারদের স্বর্গ। অঞ্জনেরি পাহাড়কে বলা হয় হনুমানজির জন্মস্থান। ৮০ ডিগ্রি খাড়া সিঁড়ি বেয়ে হরিহর ফোর্ট ওঠা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
আবার আধুনিক নাসিক ভারতের ওয়াইন ক্যাপিটাল শুনলে অবাক লাগবে, যে নাসিক কুম্ভমেলার শহর, সেই নাসিকই ভারতের *Wine Capital*। ভারতের ৯০% ওয়াইন এখানেই তৈরি হয়। সুলা ভিনইয়ার্ডস ও ইয়র্ক ওয়াইনারি সারি সারি আঙুর বাগান, সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ওয়াইন টেস্টিং বিদেশের মতো অনুভূতি। ওয়াইন প্রেমীদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো।
নাসিক কেন এত বিখ্যাত --- কুম্ভমেলা প্রতি ১২ বছর অন্তর গোদাবরীর তীরে কোটি মানুষের স্নান। প্রয়াগ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনীর সঙ্গে নাসিকও চার কুম্ভস্থলের একটি। মহারাষ্ট্রের নাসিক ও ত্র্যম্বকেশ্বরে সিংহস্থ কুম্ভ মেলা আনুষ্ঠানিকভাবে ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে শুরু হয়েছে। ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতির পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এটি চলবে জুলাই ২০২৮ পর্যন্ত প্রায় ২১ মাস। এই সিংহস্থ কুম্ভ মেলার প্রধান অমৃত স্নানের তারিখগুলো হলো:- প্রথম অমৃত স্নান হবে ২ আগস্ট, ২০২৭, দ্বিতীয় অমৃত স্নান হবে ৩১ আগস্ট, ২০২৭, তৃতীয় অমৃত স্নান হবে ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৭ নাসিক এবং ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৭ ত্র্যম্বকেশ্বরে।
ধর্ম ও পুরাণের মিলন --একদিকে জ্যোতির্লিঙ্গ, অন্যদিকে রামায়ণের পঞ্চবটী - শিব ও রাম একসঙ্গে আর কোথায় আছে? বৈচিত্র্যময় একই শহরে আপনি সকালে ত্র্যম্বকেশ্বরে জল ঢালবেন, দুপুরে পাণ্ডব গুহায় ইতিহাস দেখবেন, আর সন্ধ্যায় সুলায় আঙুর বাগানে বসে থাকবেন।
আমি এখন যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি --- সেই মাটি তিনবার পবিত্র - গোদাবরীর জলে, শিবের ত্রিনেত্রে, আর রামের চরণধুলিতে। তাই মহারাষ্ট্রের পবিত্র গোদাবরী নদীর তীরে অবস্থিত নাসিক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, প্রাচীন ইতিহাসও এক মহা তীর্থের মেলবন্ধন।