কলমে: শ্রী রাধামাধব মুখার্জী
একজন ছাত্রকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “তুমি এই উত্তরটা কীভাবে জানলে?” সে হয়তো বলবে, “স্যার, পড়েছি।” আবার একটু গভীরে গিয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়, “কিন্তু এরকম কেন হয়? নিজের ভাষায় বুঝিয়ে বলতে পারবে?” অনেক সময় সেই একই ছাত্র থেমে যাবে। কারণ সে উত্তরটি জানে, কিন্তু বিষয়টি হয়তো জানে না। এটাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি পুরোনো অথচ আজও জীবন্ত সমস্যা—মুখস্থবিদ্যা।
বছরের পর বছর ধরে আমরা বলে আসছি, শিক্ষা মানে শুধু মুখস্থ করা নয়। শিক্ষা মানে বোঝা, প্রশ্ন করা, যুক্তি দেওয়া, নিজের মতো করে ভাবা। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি কি সত্যিই বদলেছে? খুব বেশি নয়। প্রশ্নপত্রের ধরন বদলেছে, স্মার্টফোন এসেছে, স্মার্ট ক্লাসরুম এসেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসেছে, শিক্ষার নানা নতুন পদ্ধতি এসেছে। কিন্তু পরীক্ষার আগে সেই পুরোনো দৃশ্যটি এখনও দেখা যায়—“এই প্রশ্নটার উত্তরটা তাড়াতাড়ি মুখস্থ করে নাও।” “এই পাঁচটা পয়েন্ট অবশ্যই লিখবে।” “অঙ্কটা এই পদ্ধতিতে করলেই নম্বর পাবে।” “সংজ্ঞাটা হুবহু লিখবে।”
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, মুখস্থবিদ্যার যুগ এখনও শেষ হয়নি কেন? এর প্রথম কারণ, আমাদের শিক্ষার সঙ্গে পরীক্ষার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একজন ছাত্রের জ্ঞান, কৌতূহল, সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ—সবকিছুকে কয়েক ঘণ্টার একটি পরীক্ষার খাতায় মাপার চেষ্টা করা হয়। ফলে পরীক্ষায় যে বিষয়টির নম্বর পাওয়া যায়, সেটিই ধীরে ধীরে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে। ছাত্র ভাবে, “যেটা পরীক্ষায় আসবে, সেটাই পড়ব।” অভিভাবক ভাবেন, “নম্বর কত পেল?” শিক্ষক ভাবেন, “সিলেবাস শেষ হয়েছে কি?” আর বিদ্যালয় ভাবতে বাধ্য হয়, “ফলাফল কেমন হল?” এই চারটি প্রশ্নের মাঝখানে কোথাও হারিয়ে যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি—“ছাত্রটি আসলে কতটা বুঝল?”
দ্বিতীয় কারণ, মুখস্থ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। বোঝার জন্য সময় লাগে। একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করতে হয়, উদাহরণ দেখতে হয়, ভুল করতে হয়, আবার চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু মুখস্থ করার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উত্তর বারবার পড়লেই হয়। ফলে দ্রুত ফলাফল চাইলে মুখস্থবিদ্যা স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। একজন ছাত্র যদি আগামীকাল পরীক্ষায় “জলচক্র” লিখবে, তাহলে তাকে বাষ্পীভবন, ঘনীভবন ও বৃষ্টিপাতের প্রক্রিয়া বুঝিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত করে শেখানোর চেয়ে একটি সুন্দর উত্তর মুখস্থ করিয়ে দেওয়া অনেক সহজ। কিন্তু সমস্যা হল—পরীক্ষার পর কী থাকে? মুখস্থ উত্তরটি হয়তো খাতায় থাকে। কিন্তু তার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কটি ছাত্রের মনে কতটা থাকে?
তৃতীয় কারণ—আমরাই অনেক সময় শিশুদের প্রশ্ন করার অভ্যাস নষ্ট করে দিই। একটি শিশু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করে—“আকাশ নীল কেন?”, “বৃষ্টি কোথা থেকে আসে?”, “চাঁদ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলে কেন?”, “গাছ রাতে কী করে?”, “দুই আর দুই সবসময় চার হয় কেন?” শিশুর এই প্রশ্নগুলোই আসলে তার শিক্ষার দরজা। কিন্তু আমরা কখনও বিরক্ত হয়ে বলি, “এত প্রশ্ন করিস কেন?” কখনও বলি, “বইয়ে যা আছে সেটাই পড়।” কখনও বলি, “আগে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পা, তারপর এসব নিয়ে ভাবিস।” এভাবেই ধীরে ধীরে শিশুর কৌতূহলের জায়গায় জন্ম নেয় পরীক্ষার ভয়। আর যে ছাত্র প্রশ্ন করতে শেখে না, সে একসময় শুধু উত্তর মুখস্থ করতে শেখে।
চতুর্থ কারণ—অভিভাবকদের প্রত্যাশা। প্রতিটি বাবা-মা চান তাঁর সন্তান ভালো করুক। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু ‘ভালো করা’ যদি শুধুমাত্র বেশি নম্বর পাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন শিশুর কাছে শিক্ষার অর্থও বদলে যায়। ৯০ পাওয়া ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করা হয়, “১০০ পেলি না কেন?” ৮০ পাওয়া ছাত্রকে বলা হয়, “আর একটু পড়লে ৯০ পেতি।” ফলে শিশুটি বুঝতে শেখে—জ্ঞান নয়, নম্বরই সাফল্যের মাপকাঠি। তারপর শুরু হয় গাইড, সাজেশন, সম্ভাব্য প্রশ্ন, মডেল উত্তর এবং মুখস্থ করার প্রতিযোগিতা।
পঞ্চম কারণ—শিক্ষকদের উপরও বাস্তব চাপ রয়েছে। একজন শিক্ষক সবসময় নিজের পছন্দমতো শিক্ষা দিতে পারেন না। নির্দিষ্ট সিলেবাস শেষ করতে হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মূল্যায়ন করতে হয়, পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে কখনও কখনও তিনিই হয়ে ওঠেন সেই ব্যবস্থার অংশ, যে ব্যবস্থাটি তিনি নিজেও হয়তো পরিবর্তন করতে চান। এখানে শিক্ষককে দোষ দেওয়া সহজ। কিন্তু সমস্যাটি ব্যক্তির চেয়ে অনেক বড়। এটি একটি ব্যবস্থাগত সমস্যা।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—সব মুখস্থ করাই খারাপ নয়। গুণের নামতা মনে রাখা দরকার। গাণিতিক সূত্র জানা দরকার। ভাষার শব্দভাণ্ডার মনে রাখতে হয়। বৈজ্ঞানিক কিছু সংজ্ঞা বা ঐতিহাসিক তারিখও স্মৃতিতে থাকা প্রয়োজন। মস্তিষ্কে কিছু মৌলিক তথ্য না থাকলে গভীর চিন্তাও সম্ভব নয়। সমস্যা তখনই হয়, যখন মুখস্থ করা বোঝার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। একজন ছাত্র যদি জানে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, সেটি ভালো। কিন্তু সে যদি প্রশ্ন করে, “আমরা ঘূর্ণন অনুভব করি না কেন?” তখন তার শিক্ষার পরবর্তী দরজা খুলে যায়। একজন ছাত্র যদি জানে ২+২=৪, সেটি প্রাথমিক জ্ঞান। কিন্তু সে যদি বুঝতে পারে কেন ২টি বস্তু আর ২টি বস্তু একত্র করলে মোট ৪টি হয়, তখন গণিত তার কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ শিক্ষা হওয়া উচিত—তথ্য → বোঝা → প্রশ্ন → যুক্তি → প্রয়োগ → নতুন চিন্তা। শুধু তথ্য → মুখস্থ → পরীক্ষা → ভুলে যাওয়া নয়।
আজকের পৃথিবীতে মুখস্থবিদ্যার সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট। কারণ তথ্য এখন মানুষের মস্তিষ্কের বাইরে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। একটি তথ্য খুঁজে পেতে কয়েক সেকেন্ড লাগে। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষার সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু “কতটা জানি” নয়; বরং কোন তথ্য দরকার তা বুঝতে পারা, তথ্যটি সত্য কি না যাচাই করতে পারা, তার অর্থ বুঝতে পারা এবং সেই জ্ঞানকে নতুন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করতে পারা।
একজন ছাত্র যদি বইয়ের উত্তর হুবহু লিখতে পারে, সে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে পারে। কিন্তু জীবনের পরীক্ষায় তাকে আরও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। সেখানে প্রশ্ন আগে থেকে সাজানো থাকবে না। চারটি অপশন থাকবে না। কেউ বলে দেবে না, “এই উত্তরটাই মুখস্থ করে এসো।” সেখানে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভুল করতে হবে। ভুল থেকে শিখতে হবে। নতুন সমস্যার সমাধান করতে হবে। তাই আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন মানুষ তৈরি করা, যে শুধু উত্তর জানে না—প্রশ্ন তৈরি করতে জানে। যে শুধু বইয়ের কথাই পুনরাবৃত্তি করে না, নিজের চোখে পৃথিবীকে দেখতে শেখে। যে শুধু পরীক্ষার জন্য পড়ে না, জীবনকে বোঝার জন্য শেখে।
মুখস্থবিদ্যার যুগ শেষ হবে কবে? শুধু নতুন সিলেবাস বানালে নয়। শুধু স্মার্ট ক্লাসরুম করলেই নয়। শুধু ডিজিটাল বোর্ড বসালেই নয়। পরিবর্তন শুরু হবে সেদিন, যেদিন আমরা ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করব না শুধু, “কত নম্বর পেয়েছ?” বরং জিজ্ঞাসা করব, “কী শিখলে?” আর তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, “কী নিয়ে ভাবতে শুরু করলে?” সেদিন হয়তো শিক্ষার খাতায় শুধু উত্তর লেখা থাকবে না। সেখানে লেখা থাকবে নতুন নতুন প্রশ্নও। আর প্রকৃত শিক্ষা সম্ভবত সেখান থেকেই শুরু হয়।