কলমে- স্বামী আত্মভোলানন্দ পরিব্রাজক
আমাদের সত্য সনাতন ধর্মে মহালয়া হলো দেবীপক্ষের সূচনা এবং পিতৃপক্ষের সমাপ্তির একটি বিশেষ তিথি।
মহালয়ার অন্তর্নিহিত অর্থ হলো 'মহান আলয়' বা পরমাত্মার আগমন। আধ্যাত্মিক ও পৌরাণিক দিক থেকে মহালয়া হলো অন্ধকার দূর করে আলো প্রতিষ্ঠার প্রতীক। এই দিনে দেবী দুর্গা মর্ত্যে আগমনের জন্য আমন্ত্রিত হন এবং মহিষাসুর বধের মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির বিজয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এটি মূলত নিজেকে শুদ্ধ করার এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। তর্পণ বা জল-দানের মাধ্যমে পিতৃপুরুষদের স্মরণ করে মানুষ নিজের অহংকার ও মলিনতা দূর করে পরম পবিত্রতার মহান আলয়ের দিকে এগিয়ে যায়।
এই দিনটি অপূর্ব সুন্দর মূল্যবান মনুষ্য জীবনে মূলত দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক আবাহন বা শুরু হিসেবে উদযাপিত হয়। মহালয়া হলো পিতৃপক্ষ এবং দেবীপক্ষের সন্ধিক্ষণ। এর মাধ্যমে দুর্গাপূজার সূচনা হয়। দেবী দুর্গা এই দিন পৃথিবীতে অবতরণ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা পর্যন্ত এই পনেরো দিন পিতৃপক্ষ। আশ্বিনের কৃষ্ণ পক্ষের অমাবস্যা তিথিকে বলা হয় মহালয়া। মহালয়া কথাটি এসেছে 'মহত্ আলয়' থেকে।
মনে করা হয় যে পিতৃপুরুষেরা এই সময়ে পরলোক থেকে ইহলোকে আসেন জল ও পিণ্ডলাভের আশায়। এই সময়ে প্রয়াত পিতৃপুরুষদের জল-পিণ্ড প্রদান করে তাঁদের 'তৃপ্ত' করা হয়। এই দিনে প্রয়াত আত্নাদের মর্ত্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়, প্রয়াত আত্নার যে সমাবেশ হয় তাহাকে মহালয় বলা হয়। মহালয় থেকে মহালয়া --- পিতৃপক্ষেরও শেষদিন এইটি।
মহালয় প্রসঙ্গে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বলা হয়েছে, যে ক্ষণে পরমাত্মায় অর্থাৎ পরব্রহ্মে লয় প্রাপ্তি ঘটে সেটিই হল মহালয়। কেননা, পরমাত্মাই হল পরব্রহ্ম। আর নিরাকার ব্রহ্মের আশ্রয়ই হল মহালয়। তবে শ্রী শ্রী চণ্ডিতে মহালয় হচ্ছে পুজো বা উৎসবের আলয়। এখানে আলয় শব্দটির একটি অর্থ হচ্ছে আশ্রয়। চণ্ডিতে তাই 'মহালয়' বলতে 'পিতৃলোককে' বোঝানো হয়েছে। পিতৃলোককে স্মরণের ক্ষণকেই বলা হয়েছে মহালয়া। কৃষ্ণপক্ষে কালিমার ক্রমশ লয় হতে হতে অমাবস্যা তিথিতে সে লয় পূর্ণতা পায়। তাই একে বলে মহালয়া। ‘মহালয়া’ শব্দের সন্ধি বিশ্লেষণ করলে যেমন আরেক-রকম অর্থ পাওয়া যায়, তেমনই অভিধান থেকে জানা যায়, ‘মহ’ শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে। এক, ‘মহ’ বলতে বোঝায় পুজো বা উৎসব। তা থেকে ব্যুৎপত্তি করলে হয় মহ+আলয় = মহালয় অর্থাৎ পুজো বা উৎসবের আলয় বা আশ্রয়। আবার ‘মহ’ শব্দের আরেক অর্থ 'প্রেত'। অর্থাৎ প্রেতের আলয় (আশ্রয়)। সনাতন ধর্ম অনুসারে এই দিনে প্রয়াত আত্মাদের মর্ত্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, প্রয়াত আত্মার যে সমাবেশ হয় তাহাকে মহালয় বলা হয়। সেই মহালয় থেকে মহালয়া।
ভগবান শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কা বিজয়ের আগে এদিনে এমনই করেছিলেন । সেই অনুসারে এই মহালয়া তিথিতে যারা পিতৃ-মাতৃহীন তারা তাদের পূর্বপূরূষের স্মরন করে, পূর্বপূরুষের আত্নার শান্তি কামনা করে অঞ্জলি প্রদান করেন। মহালয়াতে যারা গঙ্গায় অঞ্জলি প্রদান করেন পূর্বদের আত্নার শান্তির জন্য, তাহারা শুধু পূর্বদের নয় , পৃথিবীর সমগ্র কিছুর জন্য প্রার্থনা ও অঞ্জলি প্রদান করেন। যে-অবান্ধবা বান্ধবা বা যেন্যজন্মনি বান্ধবা - অর্থাৎ যারা বন্ধু নন, অথবা আমার বন্ধু ও, যারা জন্ম জন্মাত্নরে আমার আত্নীয় বন্ধু ছিলেন, তারা সকলেই আজ আমার অঞ্জলি গ্রহন করুন যাদের পুত্র নেই, যাদের কেউ নেই আজ স্মরন করার তাদের জন্য ও অঞ্জলী প্রদান করতে হয়। যেযাং, ন মাতা, ন পিতা, ন বন্ধু - অর্থাৎ যাদের মাতা-পিতা-বন্ধু কেউ নেই আজ স্মরন করার তাদেরকে ও স্মরন করছি ও প্রার্থনা করছি তাদের আত্না তৃপ্তিলাভ করুক।
তাই, মহালয়া মানেই হলো অশুভের অবসান, মঙ্গলের আহ্বান এবং পরম শক্তির আশ্রয়ে নিজের আত্মাকে জাগ্রত করা। মহালয়ার পর দেবীপক্ষের বা শুক্লপক্ষের প্রতিপদে ঘট বসিয়ে শারদীয়া দুর্গা পুজার সূচনা করা হয়। পঞ্জিকা অনুযায়ী এই বৎসর আগামী ২২-শে আশ্বিন শনিবার ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ইংরাজি 10.10.2026. মহালয়া তিথি।