কলমে- শ্রী রাধামাধব : শ্বেতশুভ্র সন্ন্যাসিনীর বেশ, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, আর চোখেমুখে এক শান্ত সমাহিত জ্যোতি। স্বামী বিবেকানন্দের মানসকন্যা ভগিনী নিবেদিতা বললেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে নারীশিক্ষা প্রসার ও প্লেগ রোগীদের সেবায় রত এক স্নেহময়ী মায়ের ছবি। কিন্তু এই স্নিগ্ধ আবরণের আড়ালে যে এক প্রবল অগ্নিকুণ্ড জ্বলছিল, তা ক'জন জানেন?
শান্ত সমাহিত সন্ন্যাসিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই রুদ্রাণী ছিলেন ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নেপথ্য-চারিণী, অগ্নিযুগের এক গোপন ধাত্রী।
১৯০২ সালের ৪ জুলাই স্বামীজির মহাপ্রয়াণের মাত্র পনেরো দিনের মাথায় রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অরাজনৈতিক গণ্ডি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন নিবেদিতা। উদ্দেশ্য ছিল নিছকই কৌশলগত— ব্রিটিশ সরকারের রোষানল থেকে মঠকে রক্ষা করা। কারণ ততদিনে আয়ারল্যান্ডের এই বিদ্রোহী কন্যার ধমনিতে বইতে শুরু করেছে ভারতের পূর্ণস্বরাজের স্বপ্ন। ওই বছরেই বরোদায় শ্রীঅরবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং প্রমথনাথ মিত্র প্রতিষ্ঠিত 'অনুশীলন সমিতি'-র কার্যনির্বাহী পর্ষদে তাঁর যোগদান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
বাগবাজারের ১৭ নম্বর বোসপাড়া লেনে নিবেদিতার বালিকা বিদ্যালয়টি দিনের আলোয় ছিল নারীশিক্ষার পবিত্র আঙিনা, আর রাতের অন্ধকারে তা হয়ে উঠত সশস্ত্র বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত বা হেমচন্দ্র কানুনগোর মতো তরুণ বিপ্লবীদের হাতে তিনি তুলে দিতেন বিস্ফোরক তৈরির দুর্লভ সব বিদেশি বই। শুধু তাই নয়, নিজের স্কুলের ছোট বিজ্ঞানাগারটি তিনি নিঃসংকোচে ছেড়ে দিয়েছিলেন বিপ্লবীদের বোমা তৈরির প্রাথমিক গবেষণার জন্য।
বিপ্লবীদের চরম বিপদের দিনে তিনি ছিলেন এক দুর্ভেদ্য ঢাল। ১৯০৭ সালে 'যুগান্তর' সম্পাদক ও স্বামীজির অনুজ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলে তাঁর জামিনের বিপুল অর্থ নিবেদিতাই জোগাড় করেন। আবার শ্রীঅরবিন্দ যখন আত্মগোপনে বাধ্য হন, তখন তাঁর 'কর্মযোগীন' পত্রিকার সম্পাদনার দুঃসাহসিক ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন এই নির্ভীক সন্ন্যাসিনীই। এমনকি, ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকার যে নকশা তিনি করেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল দধীচি মুনির অস্থিনির্মিত ‘বজ্র’— যা বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করত চরম আত্মত্যাগের মন্ত্রে।
আয়ারল্যান্ডের এক প্রাণবন্ত তরুণী মার্গারেট নোবেল নিজের শেকড় উপড়ে ফেলে ভালোবেসেছিলেন পরাধীন ভারতের ধুলোমাটিকে। এক হাতে তিনি মুছে দিয়েছেন মহামারীর কান্না, অন্য হাতে বিপ্লবীদের জুগিয়েছেন শৃঙ্খল ভাঙার রসদ। আধ্যাত্মিকতা ও সশস্ত্র বিদ্রোহের এমন যুগপৎ সহাবস্থান ইতিহাসে বিরল।
নিবেদিতা তাই কেবল সেবিকা বা শিক্ষিকা থাকেন নি , তিনি ভারতের স্বাধীনতা যজ্ঞের এক অনির্বাণ শিখা।