কলমে-স্বামী আত্মভোলানন্দ পরিব্রাজক
আমাদের সত্য সনাতন ধর্মে মূল্যবান সুন্দর মনুষ্য জীবনে ভক্তির দ্বারা যিনি ঈশ্বর-উপাসনা করেন, নিজ নিজ ইস্ট-দেবতার, প্রাণ-দেবতার পূজা-উপাসনা করেন, বস্তুতঃ তাকেই ভক্ত বলা হয়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের ১৬ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন যে, চার ধরনের পুণ্যবান মানুষ তাঁর ভজনা করেন:-
চতুৰ্ব্বিধা ভজন্তে মাং জনাঃ সুকৃতিণোহৰ্জ্জুন।
আর্ত্তো জিজ্ঞাসুরর্থার্থী জ্ঞানী চ ভরতৰ্ষভ।। (৭/১৬)
১) আর্ত - যিনি দুঃখী বা বিপন্ন।
২) জিজ্ঞাসু - যিনি ঈশ্বরকে জানতে আগ্রহী।
৩) অর্থার্থী - যিনি ধনসম্পদ চান।
৪) জ্ঞানী - যিনি সত্য উপলব্ধি করেছেন।
শ্রীমদ্ভগবতগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ হতে নিঃসৃত বাণী অনুযায়ী ভক্ত চার প্রকার। যথা.......!
১) আর্ত ভক্ত: যে বা যিনি বিপদে পরে ঈশ্বরকে স্মরণ করেন তাকে আর্ত ভক্ত বলে। যেমন দ্রৌপদী!
২) জিজ্ঞাসু ভক্ত: যিনি জ্ঞানের দ্বারা ভগবানকে জানতে বা বুঝতে পারেন তাকে জিজ্ঞাসু ভক্ত বলে। যেমন অর্জ্জুন!
৩) অর্থাথী ভক্ত: যিনি কোন ইচ্ছা বা প্রার্থনা পূরণের জন্য ভগবানকে স্মরণ করেন তাকে অর্থাথী ভক্ত বলে। যেমন অম্বা!
৪) জ্ঞানী ভক্ত: যিনি কোন কিছুর আশা না করে শুধু ভগবানকে ভক্তি বা তাঁরই ভজনা করেন তাকে জ্ঞানী ভক্ত বলে। যেমন ভক্ত-প্রহ্লাদ!
আজ আমরা জানার চেষ্টা করব কেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভক্ত-কূলকে চার ভাগে ভাগ করেছেন...!
১) দ্রৌপদী
মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র দ্রৌপদী ছিলেন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা এবং পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী। তিনি যজ্ঞের আগুন থেকে জন্ম নিয়েছিলেন।
আর্ত ভক্ত
সত্য সনাতন ধর্মে দ্রৌপদীকে ‘আর্ত ভক্ত’ বলা হয়। কারণ, তিনি বিপদে পড়ে ভগবানের শরণাগত হন। তিনি জীবনের চরম সংকটে নিজের সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর পরম সুহৃদ শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। যারা চরম দুঃখ, বিপদ বা রোগে পড়ে ভগবানের শরণাপন্ন হন। উদ্দেশ্য কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া তাদের "আর্ত ভক্ত" ভক্ত বলা হয়।
কুরুসভার চরম সংকট পাশা খেলায় হেরে যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে বাজি রাখেন। দুঃশাসন দ্রৌপদীকে চুল ধরে টেনে কুরুসভায় নিয়ে আসে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন গুরুজন ও বীরেরা। কিন্তু কেউই দ্রৌপদীকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেননি। নিজের শক্তির অহংকার চূর্ণ হওয়া প্রথমে দ্রৌপদী কুরুসভার পণ্ডিতদের কাছে ন্যায়-বিচার চেয়েছিলেন। তিনি নিজের বীর স্বামীদের (পঞ্চপাণ্ডব) উপরও ভরসা করেছিলেন। কিন্তু সবাই নীরব ও অসহায় হয়ে বসে ছিলেন। দ্রৌপদী বুঝতে পারেন, জাগতিক কোনো শক্তি তাকে বাঁচাতে পারবে না। দুঃশাসন যখন তার বস্ত্রহরণ শুরু করে, দ্রৌপদী তখন নিজের হাত দিয়ে বস্ত্র ধরে রাখার অনেক চেষ্টা করছিলেন। একপর্যায়ে নিজের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তিনি দুই হাত ওপরে তুলে শ্রীকৃষ্ণকে ডাকেন। এই সম্পূর্ণ বা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণই হলো "আর্ত ভক্তি"। ভক্তের এই ব্যাকুল ডাকে সাড়া দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ অলৌকিক উপায়ে অন্তহীন বস্ত্র জোগান দিয়ে দ্রৌপদীর লজ্জা নিবারণ করেন। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ চার ধরনের ভক্তের কথা বলেছেন— আর্ত, জিজ্ঞাসু, অর্থার্থী ও জ্ঞানী। দ্রৌপদী এখানে চরম বিপদে পড়ে ব্যাকুল হৃদয়ে ভগবানকে ডেকেছিলেন বলেই তিনি "আর্ত ভক্তের" শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
আর্ত ভক্ত উদাহরণ:- দ্রৌপদী, গজেন্দ্র/হাতি ইত্যাদি।
২) অর্জুন
অর্জুন হলেন মহাভারতের অন্যতম প্রধান নায়ক এবং পঞ্চ-পাণ্ডবের তৃতীয় ভাই। তিনি কুন্তী ও দেবরাজ ইন্দ্রের পুত্র এবং একজন বিশ্বখ্যাত ও শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর যোদ্ধা ছিলেন।
জিজ্ঞাসু ভক্ত
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অনুযায়ী, অর্জুনকে জিজ্ঞাসু ভক্ত বলা হয়। কারণ, তিনি পরম সত্য এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানার জন্য ব্যাকুল ছিলেন। অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কর্তব্য নিয়ে তাঁর মনে চরম সংশয় জাগে। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে কৃষ্ণকে প্রশ্ন করেন। শিষ্য-রূপে আত্মসমর্পণ, তিনি শুধু বন্ধু হিসেবে কৃষ্ণের কাছে যাননি। তিনি নিজেকে কৃষ্ণের শিষ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রকৃত জ্ঞান লাভের জন্য পরম আশ্রয় প্রার্থনা করেন। আধ্যাত্মিক সত্যের সন্ধান অর্জুনের জিজ্ঞাসা শুধু যুদ্ধ জয়ের জন্য ছিল না। তিনি আত্মা, ধর্ম এবং কর্মের রহস্য জানতে চান। ইহলৌকিক সুখের চেয়ে পারমার্থিক কল্যাণ তাঁর লক্ষ্য ছিল। তিনি জানার তীব্র ইচ্ছা থেকে কৃষ্ণের শরণাপন্ন হন। তাই অর্জুনকে "জিজ্ঞাসু-ভক্তের" শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বলা হয়।
জিজ্ঞাসু ভক্ত উদাহরণ:-অর্জুন, ঋষি উদ্দালক বা সনৎকুমার জাতীয় সাধকগণ ইত্যাদি।
৩) অম্বা
মহাভারত অনুযায়ী, অম্বা হলেন মহাভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, কাশীরাজের জ্যেষ্ঠ কন্যা এবং শিখণ্ডীর পূর্বজন্ম রূপ। ভীষ্ম তাঁর সৎভাই বিচিত্রবীর্যের বিবাহের জন্য জোর করে তাঁদের তিন বোনকে স্বয়ংবর সভা থেকে হাস্তিনাপুরে নিয়ে আসেন। কিন্তু অম্বা আগে থেকেই শাল্বরাজকে ভালোবাসতেন। অম্বা ভীষ্মকে নিজের ভালোবাসার কথা জানালে তিনি তাঁকে শাল্বরাজের কাছে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু শাল্বরাজ তাঁকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। কোনো পক্ষই তাঁকে বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় অম্বা তাঁর সমস্ত দুর্ভাগ্যের জন্য ভীষ্মকে দায়ী করেন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার পণ করেন। ভীষ্মের পতনের কারণ হওয়ার জন্য অম্বা কঠোর তপস্যা করে শিবের বর লাভ করেন। তিনি পরের জন্মে রাজা দ্রুপদের ঘরে শিখণ্ডিনী বা শিখণ্ডী রূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হন।
অর্থার্থী
সত্য সনাতন ধর্মে অম্বালিকা বা দেবী অম্বাকে জগদম্বা "অর্থার্থী" ভক্তদের দেবী বলা হয় কারণ তিনি জাগতিক সুখ, সমৃদ্ধি এবং ঐশ্বর্য প্রদান করেন। "অর্থ" শব্দের অর্থ ধনসম্পদ, ক্ষমতা, স্থাবর সম্পত্তি বা জাগতিক উন্নতি। যে ভক্তরা কোনো বস্তুগত লাভ, দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি বা জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়ার উদ্দেশ্যে দেবীর আরাধনা করেন, তাদের অর্থার্থী ভক্ত বলা হয়। সহজ কথায়, যাঁরা দেবীর কাছে আধ্যাত্মিক মোক্ষ বা জ্ঞান না চেয়ে জাগতিক উন্নতি, ধনসম্পদ ও সুখ-ঐশ্বর্য প্রার্থনা করেন, তাঁদের উদ্দেশ্যেই অম্বাকে অর্থার্থী ভক্তের আশ্রয় বলা হয়। তাই তিনি "অর্থার্থী ভক্তের" শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
অর্থার্থী ভক্ত উদাহরণ -দেবী অম্বা, ধ্রুব রাজা ইত্যাদি।
৪) ভক্ত-প্রহ্লাদ
পুরাণ অনুযায়ী প্রহ্লাদ ছিলেন অসুর রাজ হিরণ্যকশিপু ও কয়াধুর পুত্র এবং ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত। অসুর বংশে জন্ম নিয়েও তিনি শৈশব থেকেই বিষ্ণুভক্তি প্রচার করেন, যা তাঁর পিতার ক্ষোভের কারণ হয়।
জ্ঞানী ভক্ত
প্রহ্লাদ কেবল একজন ভক্তই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন "জ্ঞানী ভক্ত"। কারণ তিনি ঈশ্বর বা পরম সত্যকে তাত্ত্বিক আলোচনার পরিবর্তে ব্যক্তিগত উপলব্ধির মাধ্যমে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর জ্ঞানের মূল ভিত্তি ছিল ‘আত্ম-সমর্পণ’ এবং ‘প্রেমময় ভক্তি’। শাস্ত্র অনুযায়ী তাঁর জ্ঞানী হওয়ার কারণগুলো হলো যে,
তিনি বিশ্বাস করতেন ঈশ্বর সর্বত্র এবং সকলের হৃদয়ে বিরাজমান। এই অদ্বৈত জ্ঞান তাঁকে কোনো জীব বা বস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে দেয়নি। তিনি নিজের পিতা হিরণ্যকশিপু এবং পরম শত্রুতাকে ও ঈশ্বরের ইচ্ছা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁর ভক্তি কোনো পার্থিব চাওয়া বা লাভের জন্য ছিল না। তিনি জানতেন ঈশ্বরই পরম সত্য এবং তাঁর প্রতি অবিচল বিশ্বাসই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। পুরাণ মতে, প্রহ্লাদ মাতৃগর্ভে থাকাকালীনই দেবর্ষি নারদের মুখে হরিনাম ও বিষ্ণুর মহিমা শোনেন। তাই তাঁর জ্ঞান ছিল স্বাভাবিক বা সহজাত, যা জাগতিক কোনো বিদ্যা বা গুরু দ্বারা সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজপুত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি সব ধরনের অহংকার থেকে মুক্ত ছিলেন। তিনি দরিদ্রদের প্রতি পিতার মতো, সমকক্ষের প্রতি বন্ধুর মতো এবং শত্রুর প্রতিও ক্ষমাশীল ছিলেন। তাই তিনি জ্ঞানী ভক্তের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
জ্ঞানী ভক্ত উদাহরণ: - শুকদেব, প্রহ্লাদ বা আদি শংকরাচার্য ইত্যাদি।
সত্য সনাতন ধর্মে অপূর্ব সুন্দর মূল্যবান মনুষ্য জীবনে
আমরা জানার চেষ্টা করলাম ভগবানের কাছে জ্ঞানী ভক্তই শ্রেষ্ঠ। হ্যাঁ, দুঃখ কষ্টের সময় ভগবানকে ডাকলে সাড়া দেন ঠিকই, তবে তা স্বার্থের ভালবাসা হয়ে গেল। প্রকৃত ভক্ত সেই, যে বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে প্রতিটি মুহূর্তে ভগবানের নাম স্মরণ করেন, তিনিই হলেন ভক্ত। তাই, ভক্তেরই ভগবান। তাই, ভক্ত-প্রহ্লাদ হল প্রকৃত ভক্ত।