সেখ রিয়াজুদ্দিন, বীরভূম : সাপ্তাহিক চণ্ডীদাস পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, কবি ও মানবতাবাদী চিন্তক কুমুদ কিঙ্করের ৩৮তম প্রয়াণদিবস শ্রদ্ধা ও স্মরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হলো জয়দেবের হরিদাস আশ্রমে। একইসঙ্গে আশ্রমমাতা আশালতা দেবী এবং সদ্যপ্রয়াত চণ্ডীদাস পত্রিকার সাংবাদিক পূর্ণচন্দ্র দত্তকেও স্মরণ করা হয় এদিনের অনুষ্ঠানে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে কুমুদ কিঙ্কর ও আশালতা দেবীর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন উপস্থিত অতিথিরা। পাশাপাশি পূর্ণচন্দ্র দত্তের প্রতিকৃতিতে ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এরপর অনুষ্ঠিত হয় স্মৃতিচারণা ও আলোচনা সভা।
কুমুদ কিঙ্করের একটি বহুলচর্চিত উক্তি— “দেবতা, দানব যা খুশি তাই পারবে হতে, মানুষের মতো মানুষ হওয়া শক্ত কথা।” তাঁর এই বক্তব্যকে সামনে রেখেই এদিনের আলোচনায় বারবার উঠে আসে মানবতা, সাম্য ও মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গ।
ইলামবাজার ব্লকের অজয় নদীর তীরে অবস্থিত জয়দেব গ্রাম বহু আখড়া ও সাধনক্ষেত্রের জন্য পরিচিত। সেই পরিমণ্ডলের মধ্যেই কুমুদ কিঙ্কর প্রতিষ্ঠিত হরিদাস আশ্রম একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে মানবতার বার্তা বহন করে আসছে। বক্তাদের কথায়, আশ্রমের উত্তরসূরিরাও কুমুদ কিঙ্করের সেই আদর্শ ও চিন্তাধারাকে নিজেদের কর্মধারায় ধরে রাখার চেষ্টা করে চলেছেন।
এদিন আলোচনায় হরিদাস আশ্রমের নামকরণ, তার ঐতিহ্য ও প্রতিষ্ঠার পটভূমি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। আশ্রমের মূল প্রবেশদ্বারে লেখা “নাম কর, দান কর ও সহ্য কর”—এই বাণীর তাৎপর্য নিয়েও আলোকপাত করেন বক্তারা। বর্তমান সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে এই বাণীর প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চণ্ডীদাস পত্রিকার সম্পাদক আনারুল হক, হরিদাস আশ্রমের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি তথা চণ্ডীদাস পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক আল আফতাব, কুনুর সাহিত্য পত্রিকা-র সম্পাদক চুনিলাল মুখোপাধ্যায়, কুমুদ কিঙ্করের বাল্যবন্ধু ও গীতিকার অশোক কুমার নাগ, কবি অসীম শীল, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সন্তোষ কর্মকার,-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন শান্তি কুমার রজক, স্বাগত ভাষণ দেন রণজিৎ মুখোপাধ্যায়।
আলোচনায় বীরভূম সাহিত্য পরিষদের সম্পাদক সরোজ কর্মকার এবং চণ্ডীদাস পত্রিকার সম্পাদক আনারুল হক পৃথকভাবে এক সাক্ষাৎকারে জাতপাত ও সম্প্রদায়ের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে “মানবতা”কে বৃহত্তর পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
বক্তাদের কথায়, কুমুদ কিঙ্করের জীবন ও সাহিত্যচর্চার মূল সুর ছিল মানুষকে ভালোবাসা এবং মানবিক মূল্যবোধকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর প্রয়াণের ৩৮ বছর পরেও সেই চিন্তা ও আদর্শ জয়দেবের হরিদাস আশ্রমের মতো প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।