সেখ রিয়াজুদ্দিন , বীরভূম: রাজ্যে বর্ষাকাল এলেই মশা-মাছির উপদ্রবের পাশাপাশি বেড়ে যায় সাপের আনাগোনাও। বাড়ির আশপাশ, মাঠ-ঘাট, জলাশয় কিংবা ঝোপঝাড়ে সাপের দেখা মিলতে শুরু করে। এই সময় সাপে কামড়ানোর ঘটনাও বাড়ে। কিন্তু এখনও অনেক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার পরিবর্তে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করেন। ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এই বিষয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে খয়রাসোল ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ডা. সৈয়দ সঞ্জয় হোসেন সাপে কামড়ানোর ক্ষেত্রে সচেতনতা, প্রাথমিক করণীয় এবং সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন।
বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব কেন বাড়ে?
ডা. হোসেন জানান, বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সাপের গর্তে জল ঢুকে যায়। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তারা বাড়ির আশপাশ, খেত-খামার, বাঁশঝাড়, পুকুর-নদীর ধারে এমনকি অনেক সময় ঘরের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। এছাড়া এ সময় ব্যাঙ, ইঁদুরসহ সাপের খাদ্যের প্রাচুর্য থাকায় তাদের চলাচলও বেড়ে যায়।
বর্ষাকালে কোন কোন সাপ বেশি দেখা যায়?
বিষধর সাপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
গোখরা — ফণা তোলে, অত্যন্ত বিষধর।
কালাচ — সাধারণত রাতে বের হয়, অত্যন্ত বিষধর।
চন্দ্রবোড়া — মাঠ-ঘাটে বেশি দেখা যায়, অত্যন্ত বিষধর।
সবুজ বাঁশবোড়া — গাছপালা ও ঝোপে থাকে, বিষধর।
নির্বিষ বা তুলনামূলক কম ক্ষতিকর সাপের মধ্যে রয়েছে—
দাঁড়াশ — ইঁদুর খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, মানুষের উপকারী।
জলঢোঁড়া — পুকুর, নদী ও জলাশয়ের ধারে বেশি দেখা যায়।
লাউডগা — সাধারণত গাছে থাকে, মানুষের জন্য মারাত্মক নয়।
সাপে কামড়ানোর লক্ষণ কী?
সব সাপের কামড়ে বিষ প্রবেশ করে না। তবে বিষধর সাপ কামড়ালে সাধারণত দেখা দিতে পারে—
কামড়ের স্থানে দুটি দাঁতের দাগ, ব্যথা বা ফোলা।
চোখের পাতা ঝুলে পড়া বা ঝাপসা দেখা।
কথা বলতে বা গিলতে অসুবিধা।
শ্বাসকষ্ট।
বমি, মাথা ঘোরা।
রক্তপাত বা অস্বাভাবিক ফোলা, বিশেষ করে ভাইপার জাতীয় সাপের কামড়ে।
সাপে কামড়ালে কী করবেন?
ডা. হোসেনের পরামর্শ—
রোগীকে শান্ত রাখুন, আতঙ্কিত হতে দেবেন না।
কামড়ানো অঙ্গ যতটা সম্ভব স্থির রাখুন এবং নড়াচড়া কম করুন।
আংটি, চুড়ি, ঘড়ি বা আঁটসাঁট জিনিস খুলে দিন।
ক্ষতস্থানে কোনো দড়ি বা শক্ত বাঁধন দেবেন না।
যত দ্রুত সম্ভব নিকটবর্তী সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে যান।
নিরাপদ হলে সাপটির রং বা বৈশিষ্ট্য মনে রাখুন অথবা দূর থেকে ছবি তুলুন। তবে কখনোই সাপ ধরতে যাবেন না।
যা একেবারেই করবেন না
ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা তাবিজ-কবজের ওপর নির্ভর করবেন না।
ক্ষতস্থান কেটে রক্ত বের করার চেষ্টা করবেন না।
মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করবেন না।
শক্ত করে দড়ি বা টুর্নিকেট বাঁধবেন না।
ক্ষতস্থানে বরফ, রাসায়নিক বা ভেষজ লাগাবেন না।
ওঝার কাছে যাওয়া কি যুক্তিসঙ্গত?
এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. হোসেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
"না। ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা তাবিজ-কবজে সাপের বিষের কোনো চিকিৎসা হয় না। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। সাপে কামড়ানোর একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা হলো দ্রুত সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া।"
সরকারি হাসপাতালে কী কী পরিষেবা পাওয়া যায়?
সরকারি হাসপাতাল ও ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সাধারণত রয়েছে—
জরুরি ভিত্তিতে সাপে কামড়ানো রোগীর চিকিৎসা।
প্রয়োজনে অ্যান্টি-স্নেক ভেনম (ASV) প্রয়োগ।
শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট।
রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে উচ্চতর কেন্দ্রে রেফার এবং আইসিইউ-সহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার ব্যবস্থা।
সাপের উপদ্রব এড়াতে করণীয়
বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন।
ঝোপঝাড় ও আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
রাতে বাইরে বের হলে টর্চ ব্যবহার করুন।
মাঠে কাজের সময় জুতো বা গামবুট পরুন।
বাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব কমিয়ে রাখুন।
সম্ভব হলে মেঝেতে না শুয়ে খাটে ঘুমান।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
ডা. সৈয়দ সঞ্জয় হোসেনের বার্তা, সাপে কামড়ানো মানেই আতঙ্কিত হওয়া নয়। শান্ত থেকে সময় নষ্ট না করে দ্রুত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে পৌঁছানোই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর না করে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণ করলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
সাপে কামড়ানোর প্রতিটি ঘটনাকেই জরুরি চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করে যত দ্রুত সম্ভব সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।