বসিরহাট : সুন্দরবনের রায়মঙ্গলে যেন হঠাৎ তৈরি হয় এক টুকরো সমুদ্রসৈকত। বছরের একটি বিশেষ দিনে জোয়ার-ভাটার খেলার মধ্যেই নদীর বুক থেকে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ চর। আর সেই চর ঘিরেই রাখি পূর্ণিমায় উৎসবের মেজাজে মেতে ওঠেন বসিরহাটের সুন্দরবনের হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের হেমনগর ও সংলগ্ন এলাকার মানুষ।

প্রকৃতির এই অদ্ভুত খেলা দেখতে অনেকটা সমুদ্রসৈকতের মতো। চারদিকে বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা, পাশে রায়মঙ্গলের জলরাশি আর তারই মাঝে মানুষের ভিড়। প্রথমবার দেখলে মনে হতেই পারে, এ যেন দীঘা কিংবা পুরীর কোনও সৈকত। কিন্তু আসলে এটি সুন্দরবনের প্রত্যন্ত হেমনগর, রায়মঙ্গল নদীর তীর।

রায়মঙ্গল, ঝিলা, কালিন্দী, গোমতী ও বাগনা এই পাঁচ নদীর মোহনায় শ্রাবণের পূর্ণিমায় একটি চর জেগে ওঠার কথা বহু বছর ধরেই স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। এই চরকে ঘিরে রাখিবন্ধন উৎসবও হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদনে স্থানীয়দের উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছিল, হেমনগর-সহ আশপাশের মঙ্গলচণ্ডী, সর্দারপাড়া, কুমিরমারি, কালিতলা, যোগেশগঞ্জ ও সামসেরনগর থেকেও বহু মানুষ এই চরে আসতেন।

পূর্ণিমার দিনে ভাটার সময় রায়মঙ্গলের জলস্তর অনেকটা নেমে গেলে নদীর বুক থেকে ধীরে ধীরে মাথা তুলতে থাকে বালুচর। বছরের অন্য সময়ে যে জায়গা নদীর জলের নিচে থাকে, কয়েক ঘণ্টার জন্য সেখানেই তৈরি হয় বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা। প্রকৃতির এই স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার খেলা দেখতে তাই নির্দিষ্ট এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

চর জেগে ওঠার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সকাল থেকে রায়মঙ্গলের তীরে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চর দেখতে আসেন, কেউ নদীতে নেমে স্নান করেন, আবার কেউ বালুচরে বসে সময় কাটান। মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও তুলে এই বিরল মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করতেও দেখা যায় বহু মানুষকে। রাখি পূর্ণিমাকে ঘিরে এই নদীচর কার্যত পরিণত হয় মিলনমেলায়। ছোট ছোট দোকান, খাবারের আয়োজন এবং নানা ধরনের অস্থায়ী স্টল বসে। শিশুদের উচ্ছ্বাস থেকে শুরু করে বয়স্কদের আড্ডা—সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত এলাকায় তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ। রায়মঙ্গলের তীরে একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন বহু মানুষ।
শুধু উৎসব নয়, এই চর প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র। কারণ এটি কোনও স্থায়ী পর্যটনকেন্দ্র নয়। জোয়ারের জল বাড়লে আবার সেই বালুচর তলিয়ে যায় নদীর জলে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকৃতির নিয়মে চর জেগে ওঠা এবং আবার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার এই দৃশ্যই রায়মঙ্গলের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ। চলতি বছর রাখি বন্ধন পালিত হয়েছে ২৮ অগাস্ট। পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথি ২৭ অগাস্ট থেকে শুরু হয়ে ২৮ অগাস্ট সকাল পর্যন্ত ছিল। সেই পূর্ণিমাকে ঘিরেই রায়মঙ্গলের তীরে দেখা যায় মানুষের এই জমায়েত। স্থানীয়দের কাছে এই দিনটি তাই শুধু রাখি পরানোর উৎসব নয়, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ারও দিন।
নদীর বুক থেকে জেগে ওঠা বালুচরে কয়েক ঘণ্টার জন্য তৈরি হওয়া পরিবেশে মিশে যায় উৎসবের আনন্দ, পর্যটনের আকর্ষণ এবং সুন্দরবনের নিজস্ব প্রকৃতির সৌন্দর্য। দূর থেকে তাকালে বিস্তীর্ণ বালুচর আর নদীর জলরাশি দেখে সত্যিই মনে হতে পারে, এ যেন সুন্দরবনের বুকের কোনও অচেনা সমুদ্রসৈকত। দীঘা বা পুরীর মতো স্থায়ী সৈকত নয়, জোয়ার-ভাটার নিয়মে কয়েক ঘণ্টার জন্য রায়মঙ্গলের বুকে তৈরি হওয়া এই প্রাকৃতিক চরই হেমনগরের মানুষের কাছে রাখি পূর্ণিমার বিশেষ আকর্ষণ।