সাধন মন্ডল বাঁকুড়া: রাঢ়বঙ্গের লোকসংস্কৃতির অন্যতম উৎসব ভাদু পুজো ।ভাদ্র মাস জুড়ে চলে এই ভাদু পুজো উৎসব। দক্ষিণবঙ্গের বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম জেলার বেশ কিছু অংশে ভাদু উৎসব সাড়ম্বরে পালিত হয়। আজ ভাদ্র মাসের সংক্রান্তি এই দিন ছাড়া রাত্রি জাগরণ করেন বাড়ির মহিলারা যারা সাদা মাছ ধরে ভাদু গান গেয়ে পুজো করে এসেছেন।
এছাড়া বেশ কিছু এলাকায় আজকের দিনেই ভাদু পাতা হয় এবং সারা রাত্রি গ্রামের বউ ঝি রা ভাদু গান গেয়ে রাত্রি জাগরণ করেন এবং আগামীকাল অর্থাৎ পহেলা আশ্বিন ভোরে বা সকালে নিকটস্থ নদীতে বা জলাশয়ে ভাদুকে ভাসানো হয়। আজ সংক্রান্তির দিন মাটির প্রতিমা ভাদুর সামনে নানারকম নৈবেদ্য সাজিয়ে পুজো করা হয়। নৈবেদ্যর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তালের বড়া, গুড়পিঠে, জিলিপি, মিষ্টি মিষ্টান্ন, ইত্যাদি। অন্যদিকে উৎকল ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মায়েরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির মিষ্টি যেমন ছানা শীতল, ছানা বড়া, কাঁকড়া পিঠে, ও তালের কেক নিবেদন করেন। জঙ্গলমহলের চিলতোড় গ্রামে গিয়ে দেখা গেল তারা শাড়ি কাপড় দিয়ে প্যান্ডেল করে ভাদু পুজো করছেন এবং ভাদু সম্পর্কিত গান গেয়ে এই উৎসব পালন করে চলেছেন। এখানে ভাদু কে এবং কেন তাকে পুজো করা হয় তা জানতে হলে একটু পিছনের ইতিহাসে যেতে হবে তবে তা নিয়ে বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। এলাকাবাসী মনে করেন পুরুলিয়ার কাশিপুরের পঞ্চকোট রাজবাড়ীর রাজা নীলমণি সিংহ দেও এর কন্যা ছিলেন ভদ্রাবতী অনেকেই ভদ্রেশ্বরী বলেও ডাকতেন। কথিত আছে ভদ্রাবতীর বিয়ের ঠিক হয় এক রাজ পরিবারের রাজপুত্রের সঙ্গে কিন্তু বিয়ের দিন বর বিয়ে করতে আসার পথেই ডাকাতদের হাতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সেই শোক সহ্য করতে না পেরে ভদ্রাবতী তার হবু স্বামীর চিতায় সহমরণে যান। কথিত আছে রাজা নীলমণি সিংহ তার কন্যার এই মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তাই তার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি ভাদু উৎসব শুরু করেন যা ভাদু পুজো নামে পরিচিতি লাভ করে ও রচিত হয় ভাদু গান। সেই সময় কাল থেকেই রাঢ়বঙ্গ জুড়ে পালিত হয়ে আসছে ভাদু উৎসব বা ভাদু পুজো। চিল তোড় গ্রামের বৃদ্ধা সুনীতি মহাপাত্র, বেলা রানী পাত্র বলেন আমি ছোটবেলা থেকেই ভাদু পুজো করে আসছি এটা আমাদের একটি লোকসংস্কৃতি উৎসব।
পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম ছায়া মহাপাত্র, মিতালী মহাপাত্র ,জয়শ্রী মহাপাত্র রা বলেন আমরা আমাদের পাড়ার ৩০ জন বউ ঝি রা মিলে এই ভাদু পুজো করছি। এই ভাদু পুজোতে একটা আলাদা আনন্দ রয়েছে যা রাঢ় অঙ্গের মাটির গন্ধের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে রয়েছে।। ভাদু উৎসবকে ঘিরে ভাদু গানের প্রচলন এই গ্রামে সাথে জড়িয়ে রয়েছে রামায়ণ মহাভারত সহ পৌরাণিক কাব্যগ্রন্থের কথা। তবে বর্তমানে গানে নানা রকম আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। বর্তমান আধুনিক যুগের ছেলে মেয়েরা এই সমস্ত সংস্কৃতি থেকেই অনেকটা দূরে সরে গেছে তারা মোবাইলে ব্যস্ত থেকে সময় কাটাচ্ছে। তারা আমাদের রাজ্যের সংস্কৃতি ভুলে যেতে বসেছে। এই লোকসংস্কৃতি কে বাঁচিয়ে রাখতেই আমাদের এই উদ্যোগ।