কলমে- স্বামী আত্মভোলানন্দ পরিব্রাজক
অপূর্ব সুন্দর মূল্যবান মনুষ্য জীবনে আমাদের আশাবাদী মনোভাব ভাল, কিন্তু বাস্তববাদী মনোভাব আরও ভাল। জীবনে সাফল্য চূড়ান্ত নয়, ব্যর্থতা ও কোন মারাত্মক নয়, আমাদের জীবন সংগ্রামময়, এটি চালিয়ে যাওয়ার সাহসই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, যদি ভুল ট্রেনে উঠে পড়ো, তাহলে পরের স্টেশনেই নেমে যেও, কারণ দূরত্ব যতই বাড়বে তোমার ফেরার কষ্টটা ততো বেশি হবে। লক্ষ্য করবেন দুটো অনুভূতি কখনো কাউকে বলে বোঝানো যায় না, পাওয়ার আনন্দ আর না পাওয়ার বেদনা।
তাই, নিজের মতো করে বাঁচো? কারো কাছে তুমি নগন্য, কারো কাছে তুমি জঘন্য, আবার কারো কাছে তার সবটুকুই তুমিই। যেমন, শিশুর কাছে তার মায়ের কোল। কারো কাছে তুমি ন্যাকা, কারো কাছে আবার তুমি বোকা, তুমি রাগী, তুমি অহংকারী, আসলে এর কোনটাই তুমি নও। তুমি তাদের কাছে সেরকমই যে যেটা তোমার কাছে প্রাপ্য বলে মনে করে।
আমাদের মানুষের চরিত্র হলো গাছের মতো আর প্রশংসা-খ্যাতি হলো গাছের ছায়ার মতো। গাছই আসল জিনিস, ছায়া আমাদের চিন্তা-ভাবনা, কল্পনা। দিন শেষে তুমি তুমিই। একটু ভালো, একটু মন্দ। সবটুকু ভালো হতে গেলে দেখবেন সবাইকে ভালো রেখে আপনি নিজেই ভালো নেই। পৃথিবীতে মনের শান্তির চেয়ে বড় আর কিছু নেই। তাই, যেখানেই শান্তি পাবেন সেখানেই যাবেন। পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না কারণ, পিছনে কিছু নেই।
যদি মহাভারতে আমরা কৃষ্ণের এক ব্যক্তি থেকে দিকদর্শী নায়ক হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট আলোচনা করি, পিতামহ ভীষ্মের কথা এসে যায়। কারণ এই আসনে বসার যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন একমাত্র ভীষ্ম। যদিও কৃষ্ণ এবং ভীষ্ম— পরস্পর পরস্পরের একান্ত শুভাকাঙ্খী, সুহৃদ। দুই বিরাট শক্তি তাই একে অন্যের বিপরীতে দাঁড়ালেও মুখোমুখি শ্রদ্ধায় আনত। মানীকে তো মানীই যথার্থ মান দেবেন। ভীষ্মের নিজের ব্যক্তিগত স্ত্রী-পুত্র, পরিবার কোনও কিছু না থাকলেও এক বৃহত্তর কুলকে রক্ষার তাগিদে নিজেকে বেঁধে ফেললেন আষ্টেপৃষ্ঠে।
আর কৃষ্ণ? ব্যক্তিগত পরিবার, বৃহত্তর পরিবার,কুল, বংশ, দায়দায়িত্ব সবকিছু থাকা সত্ত্বেও তাঁর অনাসক্তির কারণেই তিনি সর্বদা পদ্মপাতায় জলবিন্দুর মতো। পিতামহ ভীষ্মের অতলান্ত প্রজ্ঞা সত্ত্বেও নিজে নায়ক হয়ে উঠতে পারলেন না।
আবার অন্যে দৃষ্টিতে যদি দেখি কৃষ্ণ কখনোই অনাসক্ত ছিলেন না। তিনি বরাবরই তৎকালীন ভারতের রাজনীতিতে আসক্ত ও নিয়োজিত করেছিলেন নিজেকে। তাঁর জীবন যাত্রা দেখলে সেটা বোঝা যায়। নিজের যাদব বংশকে জরাসন্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে, দূরে দ্বারকাতে সরিয়ে নিরাপদ করার পর তিনি সম্পূর্ণ অন্যদিকে দৃষ্টি দিয়েছেন, কুরু পান্ডবদের দিকে। তিনি কর্মময়, তাই অনাসক্তি তাঁর ছিল না।
বরং ভীষ্ম অনাসক্ত ছিলেন, যে মুহুর্তে তিনি তাঁর প্রাপ্য ছেড়ে দিলেন। তারপর তিনি শুধুমাত্র নিজের পরিবারের প্রতি কর্তব্য করেছেন, তার বাইরে কিছু নিয়ে মাথা ঘামাননি।
কারণ, আমাদের নাম, পদ, প্রতিষ্ঠা, জাত-পাত, স্ত্রী বা পুরুষ আমরা নই। এই শরীরও আমাদের নয়। অগ্নি, জল, বায়ু, পৃথিবী, আকাশ দিয়ে এই শরীর/দেহ মন্দির নির্মিত। অবশেষে এই শরীর পঞ্চভূতেই বিলীন হবে। কিন্তু আত্মা স্থির, আমরা আত্মা। আত্মার জন্ম বা মৃত্যু হয় না। আত্মা অবিনশ্বর, আত্মভাবে থাকাই আমাদের প্রকৃত মুক্তি, এটি একটি চিরন্তন সত্য l
নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ।।গীতা২/২৩
অর্থাৎ -- এই আত্মাকে শস্ত্রাদি ছেদন করিতে পারে না, অগ্নি দগ্ধ করিতে পারে না, জল সিক্ত করিতে পারে না, এবং বায়ু ইহাকে শুষ্ক করিতে পারে না। তাই, আত্মা একমাত্র অবিনশ্বর।