সেখ রিয়াজুদ্দিন , বীরভূম : হিংলো নদীর তীব্র ভাঙনে চোখের পলকে গৃহহীন হয়ে পড়লেন একাধিক পরিবার। চোখের সামনে সারা জীবনের সম্বল নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে দেখেও অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোনও উপায় রইল না বীরভূমের দুবরাজপুর ব্লকের লোবা গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত পলাশডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দাদের।
গত কয়েকদিনের নিম্নচাপজনিত অবিরাম বৃষ্টিতে হিংলো নদীর জলস্তর ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় পলাশডাঙ্গা গ্রামের আঁকুড়ে পাড়ায় শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙন। ইতিমধ্যেই জলের তীব্র তোড়ে নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে একাধিক বসতবাড়ি। নদীর কিনারায় বিপজ্জনক অবস্থায় ঝুলছে আরও বেশকিছু ঘর। যে কোনও মুহূর্তে সেগুলিও নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এলাকার মানুষজন।
পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক যে, নিজেদের ঘরবাড়ির যতটুকু সম্ভব রক্ষা করতে সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন গ্রামবাসীরা। তড়িঘড়ি ঘরের টিনের চাল, আসবাবপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন দুর্গত পরিবারগুলি।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, গত তিন-চার বছর ধরেই হিংলো নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। তবে চলতি বছরে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, নদীগর্ভ থেকে অবৈজ্ঞানিক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালি উত্তোলনের ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, লাগাতার বালি তোলার কারণে নদীগর্ভ গভীর হয়ে যাওয়ায় জলের স্রোত সরাসরি এসে আছড়ে পড়ছে গ্রামের বসতভিটার উপর।
গৃহহীন স্থানীয় বাসিন্দা আকালী বাউরি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের ঘর-দুয়ার সব বানে ভেসে চলে গেল। অনেকগুলো ঘর নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। আমরা কোথায় থাকব, কী খাব বুঝতে পারছি না।
অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা হোসেন মণ্ডল প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নদী থেকে লাগামহীন বালি তোলার কারণেই আজ এই বিপর্যয়। ক্যানেল ডিপার্টমেন্ট কিছুদিন আগে কাজ করতে এসেছিল, কিন্তু দুর্যোগের
কারণে সেই কাজ অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছে। প্রতি বছরই ঘরবাড়ি ভাঙে, রাজনৈতিক নেতারা আসেন, দেখেন এবং চলে যান। সাহায্য বলতে কয়েক কেজি চাল-ডাল ও একটি ত্রিপল মেলে। কিন্তু ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ তৈরির কোনও স্থায়ী সমাধান হয় না।”
ক্ষতিগ্রস্তদের অবিলম্বে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনে ভাঙনকবলিত গোটা এলাকাকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা।
ঘটনার খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার তড়িঘড়ি এলাকায় পৌঁছান স্থানীয় বিধায়ক অনুপ কুমার সাহা, দুবরাজপুরের ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক শুভদীপ চট্টোপাধ্যায় এবং দুবরাজপুর থানার ওসি অমিত প্রামাণিক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা পরিবারগুলিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে জানা গিয়েছে।
বিধায়ক অনুপ কুমার সাহা জানান, নদীগর্ভে বসতবাড়ি হারানো পরিবারগুলির পুনর্বাসন এবং তাঁদের নতুন করে বসতবাড়ির ব্যবস্থা কীভাবে করা যায়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের ফলেও এলাকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
হিংলো নদীর অব্যাহত ভাঙনে এখন কার্যত আতঙ্কে দিন কাটছে পলাশডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দাদের। দ্রুত স্থায়ী ভাঙন রোধের ব্যবস্থা না হলে আগামী দিনে আরও বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারাতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।